বিসিক চামড়া শিল্পনগরী

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে ব্যাহত কার্যক্রম রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে শঙ্কা

কোরবানির ঈদ গেছে প্রায় এক মাস। এরই মধ্যে ঢাকার বাইরে থেকে ট্রাকভর্তি লবণযুক্ত কাঁচা চামড়া আসছে সাভারের বিসিক চামড়া শিল্পনগরীতে।

কিন্তু গ্যাসের তীব্র সংকট ও লোডশেডিংয়ে ঈদের পর সংগ্রহ করা কাঁচা চামড়াই ট্যানারিগুলোতে প্রক্রিয়াজাত না হয়ে পড়ে আছে। এর মধ্যে নতুন করে আসা চামড়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন মালিকরা। তারা বলছেন, এমন পরিস্থিতি আগে কখনো দেখেননি। বাধ্য হয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ে চিঠিও দিয়েছেন। কিন্তু এখনো মেলেনি কোনো সমাধান। শিল্পনগরীর দায়িত্বে থাকা বিসিকের কর্মকর্তার কাছ থেকেও পাননি আশ্বাস। এতে একদিকে বাড়ছে আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি, অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ে বিদেশী ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্পনগরী স্থানান্তরের সময় ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এবারের কোরবানির ঈদের পর থেকেই শিল্পনগরীতে তীব্র বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রায় ১০ দিন ধরে গ্যাসের চাপ অস্বাভাবিকভাবে কম। এর সঙ্গে দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎও থাকে না। ফলে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। কোনো কোনো কারখানায় দিনের বেলায় কাজ পুরোপুরি বন্ধ থাকে।

সরজমিনে দেখা যায়, সালমা ট্যানারিতে লবণযুক্ত চামড়াগুলো পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। মেশিনগুলো বন্ধ, নেই কোনো কর্মযজ্ঞ। পুরো ট্যানারি ঘুরে মাত্র একজন নারী শ্রমিক পাওয়া গেল। তিনি জানান, গ্যাস ও বিদ্যুৎ না থাকায় দিনের বেলা কাজ বন্ধ থাকে। রাতের বেলা কাজ করেন তারা। এমন অবস্থায় বেতন পাওয়া নিয়েও দুশ্চিন্তা ভর করেছে তার মাথায়। অনেকটা একই অবস্থা এবিএস ট্যানারি, আজমেরি লেদার ও একে লেদারে। ঘুরছে না রাসায়নিকের ড্রাম, কাজ প্রায় বন্ধ, ব্যস্ততা নেই শ্রমিকদের।

র‍্যামেক্স করপোরেশন লিমিটেডের টেকনিক্যাল কনসালট্যান্ট ও লেদার প্রকৌশলী শরীফ মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন সবগুলো ট্যানারিতে চামড়া ঢুকছে। এ চামড়াকে আমরা প্রথমে ওয়েটব্লু চামড়ায় রূপান্তরিত করি। যাতে পচন থেকে রক্ষা পায়। এটা অনেকটা একটা ভবনের ফাউন্ডেশনের মতো। এখানে বিদ্যুতের প্রচুর দরকার। আমরা যখন কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করি, তখন অনেক রাসায়নিক ব্যবহার করতে হয়। ড্রামে দেয়ার পর যখন বিদ্যুৎ চলে যায়, তখন চামড়া আটকে যায়। এতে চামড়ার মান একেবারে নষ্ট হয়ে যায়।’

তিনি আরো বলেন, ‘কোনো কোনো দিন ৭০ শতাংশ চামড়ার মান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গড়ে যা প্রায় ৫০ শতাংশ। শুরুতেই যদি মান নষ্ট হয়ে যায়, আমি পরে যত ভালো রাসায়নিকই ব্যবহার করি না কেন, লাভ নেই। তখন রফতানি করতে গেলে এ চামড়া বাদ হয়ে যায়।’

ট্যানারিতে গ্যাসের প্রয়োজনীয়তার গুরুত্ব তুলে ধরে বিসিক শিল্পনগরীর একে লেদার কমপ্লেক্সের চিফ লেদার টেকনোলজিস্ট রুবেল হোসেন বলেন, ‘ট্যানারির অধিকাংশ কাজই গ্যাসনির্ভর। ওয়েট ব্লুয়ের পর ক্রাস্ট প্রসেসিং ধাপ আসে। বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯৫ শতাংশ ক্রাস্ট চামড়া রফতানি হয়, যার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু গ্যাস না থাকলে প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা পাওয়া যায় না। পানির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। এখন বর্ষাকালের ভেজা আবহাওয়া। গ্যাস না থাকায় টানেল মেশিনে চামড়া শুকাতে পারছি না। চামড়া ঠিকভাবে শুকানো না গেলে পরে প্লেট মেশিনে দিলে এর ওপর দাগযুক্ত বা অসমান আবরণ তৈরি হয়। এমন চামড়া আন্তর্জাতিক ক্রেতারা গ্রহণ করেন না। শেষ পর্যন্ত সেগুলো ট্যানারিতেই পড়ে থাকে।’

এমন অবস্থায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের দাবি জানিয়ে সম্প্রতি শিল্প মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব বরাবর চিঠি ইস্যু করেছেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিসিক শাখার সহকারী সচিব মনজু আরা বেগম।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘কোরবানির আগেই আমরা কমপক্ষে তিন মাস গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বলেছিলাম। কিন্তু গত ১০ দিন ধরে গ্যাস পুরোপুরি বন্ধ আছে। আমার নিজের কারখানার কাজও প্রায় বন্ধ। যে চামড়া সংগ্রহ করেছিলাম তা পড়ে আছে। আমাদের শ্রমিকরা বেকার হয়ে বসে আসে। আমাদের মূল ব্যবসা তো কাঁচা চামড়া রফতানি করা। সেটা যদি করতে না পারি, তাহলে শ্রমিকদের বেতন কীভাবে দেব। টাকা বের করতে না পারলে তো ব্যবসা টেকানো যাবে না।’

রফতানি আদেশ বাস্তবায়নে শঙ্কার কথা জানিয়ে এ নেতা বলেন, ‘কোরবানির সময় আমাদের মূল ব্যবসা হয়। কিন্তু এখন কোনো ক্রয়াদেশ নিতে পারছি না। সরকারের কাছে দাবি জানালেও সমাধানের আশ্বাস তারা দিচ্ছে না। এটি অব্যাহত থাকলে নতুন করে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়বে আমাদের সবার জন্য।’

এবিএস ট্যানারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমাম হোসেন বলেন, ‘আমরা যে চামড়া কিনেছি তা কীভাবে বাঁচাব সেটা নিয়ে চিন্তায় আছি। গ্যাস তো থাকেই না। বিদ্যুৎও ৭-৮ ঘণ্টা করে থাকে না। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, লবণ দেয়ার আগে চামড়া পচছে, এখন লবণ দেয়ার পর পচবে প্রক্রিয়াজাত করতে না পারার কারণে।’

বিদ্যুৎ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এ শিল্পনগরীর দায়িত্বে থাকা বিসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহরাজুল মাঈয়ান। মুঠোফোনে তিনি বণিক বার্তাকে জানান, সাভারের অন্যান্য এলাকার তুলনায় এখানে লোডশেডিং কম। আর গ্যাসের বিষয়টি দেখবে তিতাস। তিনি তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছেন। এখন তার করার কিছু নেই।

আরও